রাইনকন্যার জলস্ফুলিঙ্গ (ভ্রমণকাহিনি)

জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট থেকে রওনা দিল আমাদের ট্যুর বাস। গন্তব্য সুইজারল্যান্ড। ট্যুর গাইড জনাব জেজে এক হাতে বাস চালাচ্ছেন এবং আরেক হাতে মাইক্রোফোন ধরে ধারাবর্ণনা দিচ্ছেন। কখনোবা পাইপসদৃশ কিছু একটাতে কয়েক টান দিয়ে ধোঁয়া ওড়াচ্ছেন। ওদিকে ধোঁয়া উড়ছে আর এদিকে উড়ছে আমার প্রাণ! শশব্যস্ত মানুষের হাতে বাসের নিয়ন্ত্রণ-এর চেয়ে হরর বিষয় আর কী হতে পারে! তবে জেজেমশাই ভয়াবহ স্মার্ট। তিনি বললেন, ‘আমাদের এবারের গন্তব্য রাইন ফলস। ইউরোপের বৃহত্তম জলপ্রপাত। আমরা বাস নিয়ে জার্মানির দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে বের হব। যাব সুইজারল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাংশের শহর সাফহাউজেনে।’

জেজে কথা বলে চলেছেন আর আমি মানিব্যাগ খুলে দেখে নিলাম সুইস ফ্রাংক ঠিকঠাক আছে কিনা। অর্থ ছাড়া জীবন অর্থহীন-ইউরোপ ভ্রমণে বেরিয়ে আমার সবচেয়ে বড় উপলব্ধি। ভোগ তো দূরের কথা; ত্যাগও সম্ভব না অর্থ ছাড়া। ভ্রমণকালীন আরও একটি উপলব্ধি হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, মানুষের কল্পনা সীমাহীন। ঘোরাঘুরির কারণে বাক্যটি আমার কাছে মূল্য হারিয়েছে। মানুষের কল্পনারও একটা সীমা আছে; বরং বাস্তবতার কোনো সীমা দেখছি না! যত দেখছি, তত অবাক হচ্ছি! সৃষ্টিজগৎ কত বিচিত্র হতে পারে, তা চোখে না দেখলে আমার পক্ষে কল্পনা করা অসম্ভব ছিল! যাহোক, রাইন জলপ্রপাতের নাম শুনে মনে পড়ে গেছে ছেলেবেলার কথা। ভূগোল বইয়ে ‘রাইন’ নদীর নাম পড়েছিলাম। সুইস আল্পস পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়েছে ইউরোপের অন্যতম দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ এই নদী। সুইজারল্যান্ড ছাড়াও জার্মানি, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসের অসংখ্য বড়বড় শহর গড়ে উঠেছে এ নদীর তীরে। নানা সভ্যতার সাক্ষী এবং অসংখ্য উন্নত জনপদের হাজার-হাজার বছরের সঙ্গী রাইন নদী এক পর্যায়ে গা এলিয়ে দিয়েছে উত্তর সাগরে।

আমার মোবাইল সিম ‘থ্রি’ কোম্পানির। ইউরোপের যে দেশেই ঢুকছি, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই দেশের নেটওয়ার্ক নিয়ে নিচ্ছে। নিজের প্যাকেজ থেকেই ডাটা ব্যবহার করতে পারছি, নেট ব্রাউজিং করতে পারছি- ডিজিটাল যুগে এটি বড় আনন্দের। নেট ঘেটে জানতে পারলাম, জলপ্রপাত হয় নানা ধরনের; যেমন- প্লাঞ্জ, র‌্যাপিড, ক্যাটারাক্ট, ব্লক, ক্যাসকেড ইত্যাদি। দৈর্ঘ্যের চেয়ে বেশি প্রস্থযুক্ত বলে রাইন ফলস ব্লক প্রজাতির জলপ্রপাত। এসব তথ্য তেমন কোনো কাজে আসেনি জীবনে; তবু এগুলো আমাকে অকথ্য আনন্দ দেয়। যেকোনো তথ্য জানতে পারলেই মনে হয় নিজেকে সমৃদ্ধ করেছি, বৃদ্ধ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছি!

জার্মানির ভেতর দিয়ে বাস ছুটছে আর আমি তাকিয়ে দেখছি শুধুই সবুজ- মাঠ ও গাছের ছড়াছড়ি। ঘরবাড়ির নকশা ও উপাদান বদলে গেছে জার্মানির দক্ষিণের শহরে। হঠাৎ পার হয়ে গেলাম জার্মানি- কোনো দেয়াল নেই; কোনো ফটক নেই। কিছুক্ষণ পর জেজে-র কথায় বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থ হয়ে গেলাম! রাইনকন্যা রাইন জলপ্রপাত দেখতে পেলাম বাসে বসেই। রাইন নদীর প্রাকৃতিক ভাঁজে সৃষ্টি হয়েছে এই অপার সৌন্দর্যের আধার- রাইন ফলস। বেশ অনেকটা দূরে বাস থামলেও সেখান থেকেই শুনতে পেলাম জলস্তম্ভের প্রবল গর্জন। মুগ্ধ করার মতো সৌন্দর্য যে শুধু কোমলতা ও স্থিরতায় না; কাঠিন্য ও প্রবল গতিশীলতায় সৃষ্টি হতে পারে, তা রাইন জলপ্রপাত দেখলেই বোঝা যায়। তেড়ে আসা পানির তোড়কে দুই ভাগ করে দিচ্ছে মধ্যস্থিত সুউচ্চ ত্যাড়া পাথর খণ্ড।

রাইন ফলস বা রাইন জলপ্রপাতের কাছে যাওয়া যায় কয়েকভাবে। টুরিস্ট বাসগুলো থামে উর্থ ক্যাসেলের দিকে। রাইন নদীর বুকে জলপ্রপাতের কাছাকাছি ছোট্ট একটি দ্বীপে চৌদ্দ শতকে উর্থ জলদুর্গটি নির্মিত হয়। বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রথমে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয়। সেপ্টেম্বরে ভালোই রোদ পড়েছে; তারপরও ঠাণ্ডা বাতাসের কারণে গায়ে শীতবস্ত্র চাপাতে হলো। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই চোখে পড়ল উর্থ জলদুর্গে যাওয়ার স্বল্পদৈর্ঘ্য সেতু। সেতুর কাছে নদীর গভীরতা একদম কম হওয়ায় রাইনের স্বচ্ছ পানির ভেতর তাকালে তলদেশ দেখা যায়। তাতে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝাঁকেঝাঁকে মাছ! এছাড়া নদীবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা রাজহাঁস। সেতুর ওপরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মাছের জলকেলি দেখলাম। তারপর হেঁটে গেলাম উর্থ দুর্গে। এখানে পর্যটকদের জন্য রয়েছে খানাপিনা ও সুভ্যেনির সংগ্রহের ব্যবস্থা। রেস্টুরেন্টে বসে উপভোগ করা সম্ভব রাইনফলের নয়নাভিরাম দৃশ্য। বিশ্বখ্যাত জার্মান লেখক গ্যেটে এখানে বসে ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতে উপভোগ করেছেন রাইনকন্যার সৌন্দর্য। আমরা অর্ডার করলাম স্ট্রবেরি আইসক্রিম। সুইস আইসক্রিম ভোগ করতে করতে উপভোগ করলাম শেষ বরফযুগ অর্থাৎ প্রায় চৌদ্দ থেকে সতেরো হাজার বছর আগের বিস্ময়কর প্রাকৃতিক নিদর্শন। রাইনের জলরাশির তুমুল বেগে পতন জলীয় কণা ছড়িয়ে দিচ্ছে অনেকটা স্থানজুড়ে। জলের সেই তোড় শুধু চোখ জুড়ায় না; হৃদয়েও দোলা দেয়।

সস্ত্রীক লেখক। পেছনে দেখা যাচ্ছে উর্থ জলদুর্গ এবং রাইন জলপ্রপাত।

অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের জন্য এখানে আয়োজনের কমতি নেই। উর্থ ক্যাসেলের কাছ থেকে নৌকার চড়ে যাওয়া যায় রাইন জলপ্রপাতের উৎক্ষিপ্ত জলরাশির মধ্যে; এমনকি নেমে পড়া যায় মাঝের পাথরখণ্ডের ভেতরে গড়া পাটাতনে। তার অভ্যন্তরে তৈরি সিঁড়ি বেয়ে চলে যাওয়া যায় একদম জলপ্রপাতের শীর্ষে! রাইন ফলসের পাশে টিলাশীর্ষে আছে লাউফেন রাজপ্রাসাদ। সেখান থেকে রাইনকন্যার জলস্ফুলিঙ্গ দর্শনের ব্যাপারটি নিশ্চয়ই রাজকীয় হবে! এই খুদে লেখকের সামর্থের বাইরে সেসব। উর্থ জলদুর্গ থেকে বের হয়ে হেঁটে যাওয়া যায় জলপ্রপাতের কাছে। হাঁটাহাঁটি স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম এবং সূর্যালোক ভিটামিন ডি এর উৎস! আমরা স্বাস্থ্যকর উপায়ে ভিটামিন ডি খেতে খেতে গেলাম জলপ্রপাতের কাছাকাছি। আমি হাত দিয়ে ধরলাম আমার হৃদয়। কারণ, খ্যাতিমান জার্মান রোমান্টিক কবি এডুয়ার্ড মরিকে-এর মতো আমিও বলতে চাই,

‘‘হৃদয়খানি ধরে রাখো, হে পর্যটক, শক্ত হাতে,
আমি তো প্রায় হারাচ্ছিলাম, আমার হৃদয়, মুগ্ধতাতে!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *